সেন্টমার্টিনে স্বেচ্ছায় কোয়ারেন্টিনের ৫৬ দিন

সেন্টমার্টিন দ্বীপে বেড়াতে এসেছিলাম আমরা কয়েকজন। করোনাভাইরাসের কারণে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করতেই অন্য ভ্রমণপ্রেমীরা দ্বীপ ছেড়ে চলে গেছে। ইচ্ছে করেই দ্বীপে থেকে গেলাম আমরা তিনজন। এখানেই কেটে গেলো ৫৬ দিন। প্রায় দুই মাসে সেন্টমার্টিনকে পেয়েছি ভিন্নভাবে।

শুরু থেকে বলি। কিছুদিন অবকাশযাপনের জন্য গত ১৫ মার্চ সেন্টমার্টিন আসি। চারদিন পর দ্বীপ থেকে সবশেষ জাহাজ ছেড়ে যায়। তখন ফিরবো কিনা তা নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় পড়ে যাই। ভেবে দেখলাম– ঢাকায় গিয়ে কোনও কাজ নেই, অফিস বন্ধ থাকবে। ইতালি বা স্পেনের মতো অবস্থা হলে তো বাসা থেকেই বের হতে পারবো না। শেষ পর্যন্ত হিসাব মিলিয়ে দেখলাম দ্বীপে থেকে যাওয়াই ভালো। এ সুযোগে নির্জন দ্বীপ উপভোগ করা যাবে।

অপরূপ সেন্টমার্টিন

আমরা উঠেছিলাম সায়রী ইকো রিসোর্টে। আমার রুম একেবারে সাগরপাড়ে। ফিতা দিয়ে মাপলে তিন ফুটের বেশি হবে না। ঢেউয়ের শব্দ শুনতে শুনতে ঘুমাই, আবার ঘুম থেকে জেগে উঠি ঢেউয়ের শব্দে। আমরা তিনজন– আমি, সালেহ রেজা আরিফ ও আরশাদ হোসেন টুটু ভাই। রিসোর্টের দুই কর্মী মিলিয়ে আমরা পাঁচজন। রান্নাবান্না নিজেরাই করবো সিদ্ধান্ত নিলাম। দুই দিন যেতে না যেতেই একটা সুন্দর রুটিন হয়ে গেলো। দুপুর ১২টায় ঘুম থেকে ওঠা, রান্না শেষ করে খেয়ে ফেসবুকে ডুবে থাকা। বিকালে সৈকতে হাঁটাহাঁটি। সূর্যাস্ত দেখে রাতের রান্না শেষে খেয়ে-দেয়ে ছবি দেখি। রাত ২টা-৩টার দিকে ঘুমিয়ে পড়ি।

অপরূপ সেন্টমার্টিন

দেখলাম প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা হচ্ছে। যেমন জোয়ার-ভাটার সূচি, প্রতিদিন একেক রকম সূর্যাস্ত, নীল আকাশে সাদা মেঘের দল– সবই মুহূর্তেই পরিবর্তন হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো লেগেছে দ্বীপবাসীর সংস্কৃতি। পর্যটন মৌসুমে স্বাভাবিকভাবেই তারা একটু বাণিজ্যিক মনোভাব নিয়ে থাকে। কিন্তু এখন তা সম্পূর্ণ ভিন্ন।

আমরা তেমন মাছ কাটতে পারি না। মাঝে মধ্যে রিসোর্টের পাশের ঘরের ইসহাক ভাইয়ের মেয়েরা মাছ কেটে দেয়। পাশের বাড়ির কাশেম ভাইয়ের ঘরে ভালোমন্দ রান্না হলে আমাদের এনে দেয়। মফিজ ভাইয়ের জমির তরমুজ এবং জাবেদ ভাইয়ের জমি থেকে আনা সবজি কপালে জুটেছে। আজিজ ভাইয়ের ফ্রিজ ব্যবহার করতে পারছি সবসময়। এককথায় অসাধারণ আতিথেয়তা।

অপরূপ সেন্টমার্টিন

দ্বীপের বাসিন্দাদের আঞ্চলিক শব্দ থেকে মিষ্টি কিছু শব্দ শিখলাম। এখানে বিবাহের অনুষ্ঠানকে বলা হয় ‘মেলা’, মুরগীর রোস্টকে ‘দুরুস কুড়া’, নাপিতকে বলা হয় ‘চুল মিস্ত্রী’ আর লবস্টার হচ্ছে ‘পাইন্না পোক’। রিটা মাছকে এখানকার মানুষ ডাকে ‘গুইজ্জা মাছ’। মিলাদ মাহফিলকে বলা হয় ‘জলসা’। বিচকে বলা হয় ‘বিক্স’। সাইকেলকে ডাকে ‘সারকেল’। তরমুজের নাম এখানে ‘গোলা’।

সেন্টমার্টিনের পূর্ব উপকূল থেকে মিয়ানমারের দূরত্ব প্রায় ১৪ কিলোমিটার। প্রথম ১০-১২ দিন ওপারের পাহাড়গুলো দেখাই যায়নি। ধীরে ধীরে আকাশ পরিষ্কার হতেই এখন সেগুলো স্পষ্ট চোখে পড়ে। আর পানির রঙ পুরো নীল। সমতলে বৃষ্টি হলেও এখানে অনেক পরে নামে। এ বছর প্রথম বৃষ্টি হয়েছে এপ্রিলের শেষের দিকে। বৃষ্টির পর সৈকতের কেয়া গাছ ও নারকেল গাছের পাতাগুলো যৌবন ফিরে পেয়েছে। চোখের সামনে প্রকৃতির এমন পরিবর্তন দেখা সৌভাগ্যের।

দিনেরাতে অপরূপ সেন্টমার্টিন

দ্বীপের আকাশ একেক দিন একেক রকম থাকে। প্রতিদিনের সূর্যাস্ত কেমন যেন অদ্ভুত মায়া ছড়ায়। প্রতিবারের চেয়ে এ বছর প্রায় ১৫-২০ দিন আগেই পর্যটকের জন্য সেন্টমার্টিন বন্ধ করে দেওয়া হয়। গ্রিন ও অলিভ কচ্ছপের ডিম দেওয়ার সময় হলো ঠিক তখন। গত বছরের তুলনার এবার ছয়টি কচ্ছপ বেশি ডিম দিয়েছে। ছয়টি কচ্ছপের ডিম মানে প্রায় ১২০০টির অধিক। ভাবা যায়!

আমরা আসার আগে একটা অলিভ কচ্ছপ আমাদের রিসোর্টের সামনে ২১৮টি ডিম দিয়ে গিয়েছিল। সেই ডিম থেকে ৩০ এপ্রিল বাচ্চা ফুটেছে। বাচ্চাগুলো হ্যাচিং থেকে তুলে সাগরে ছাড়ার মুহূর্তটা ছিল রোমাঞ্চকর। মার্চ-এপ্রিলে সাগরে মাছ ডিম দেয়। সাগরের ৮০ শতাংশ মাছ উপকূলীয় অঞ্চলে এসে ডিম পাড়ে। কারণ সূর্যের তাপ ডিম থেকে বাচ্চা ফুটতে সহায়ক। এ বছর লকডাউন থাকার কারণে মাছ ধরার বোট সাগরে যায়নি। ফলে আশা করা যায়, আগামী মৌসুমে অনেক মাছ পাওয়া যাবে।

এখনও সেন্টমার্টিনে আছি। লকডাউন শেষ হলে বাড়ি ফিরবো। দ্বীপে আবার কবে আসা হবে জানি না। তবে এখানে থেকে মনে হচ্ছে জীবনের সোনালি সময় কাটছে।
ছবি: লেখক

  • এনজামুল হক

Source Link

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!