শাহজালাল বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে খালাস নিতে না পারায় পণ্যের স্তূপ জমেছে

করোনা ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট পরিস্থিতিতে খালাস নিতে না পারায় হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরের গুদামে পণ্যের স্তূপ জমেছে। অবস্থা এমনই যে, গুদামের ভেতরে জায়গা না থাকায় আমদানি করা পণ্য খোলা আকাশের নিচে রাখতে হচ্ছে। আর রোদে পুড়ে বৃষ্টিতে ভিজে নষ্ট হচ্ছে আকাশের নিচে থাকা শতকোটি টাকার এসব পণ্য। এ দিকে সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয়ের অভাবে আমদানিকারকদের গুনতে হবে বাড়তি গুদাম ডেমারেজ। এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত আমদানিকারকরা গুদাম ডেমারেজ মওকুফ চাচ্ছেন।

বৃহস্পতিবার কার্গো ভিলেজ ঘুরে দেখা যায়, গুদামের ভেতরে তিল ধারণের জায়গা নেই। ঠাসাঠাসি করে একটির ওপর আরেকটি কার্টন রাখা হয়েছে। এসব কার্টনের ভেতরে কী পণ্য আছে, তা দেখার প্রয়োজনও বোধ করছেন না কর্মীরা। অথচ ওয়্যার হাউসের এসব পণ্য থরে থরে সাজিয়ে রাখার কথা। কিছু ওয়্যার হাউসে র‌্যাক থাকলেও তাতে প্লেট দেখা যায় নি। ফলে মালামাল রাখা যাচ্ছে না। বাধ্য হয়ে তা মাটিতে স্তূপ আকারে রাখা হয়েছে।

অন্যদিকে ভেতরে জায়গা না থাকায় কার্গো গোডাউন, ওয়্যার হাউস ও ক্যানোপি থেকে রানওয়ে পর্যন্ত খোলা আকাশের নিচে অযত্ন আর অবহেলায় মালামাল ফেলে রাখা হয়েছে। এসবের বেশির ভাগই কাপড়ের রোল এবং শিল্পের জন্য আমদানি করা পণ্য। বৃহস্পতিবার বিকালে বৃষ্টিতে এসব রোল এবং কার্টনগুলোয় পানি প্রবেশ করতে দেখা গেছে। কার্টনের ভেতরে থাকা পণ্য বেরিয়ে এসেছে। এ ছাড়া গোডাউনের ভেতরের কার্টনও ভিজতে দেখা গেছে।

বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, সাধারণ ও বাণিজ্যিক পণ্যের ক্ষেত্রে আমদানির দিন থেকে ৫ম দিন পর্যন্ত গুদাম ডেমারেজ নেয়া হয় না। কিন্তু প্রতি কেজি পণ্যের হ্যান্ডলিং চার্জ সাড়ে ৩ টাকা নেয়া হয়। এরপর ৬ষ্ঠ থেকে ১৫তম দিন পর্যন্ত ইউনিটপ্র তি (৫০ কেজিতে এক ইউনিট) ২৫ টাকা হারে, ১৫ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত ইউনিট প্রতি ৫০ টাকা হারে এবং এক মাস পর প্রতিদিনের জন্য ১০০ টাকা হারে গুদাম ডেমারেজ দিতে হয়। একই সঙ্গে ডেমারেজর ওপর ১৫ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হয় আমদানিকারকদের। গুদামের ধারণ ক্ষমতা ১২শ’ টন। বর্তমানে দ্বিগুণের বেশি পণ্য গুদামে রয়েছে। স্থান না থাকায় রানওয়েতে রাখা হয়েছে অনেক পণ্য।

ভুক্তভোগী ব্যবসায়ীরা জানান, করোনায় উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ব্যবসা-বাণিজ্য চাঙ্গা করতে প্রণোদনা দিচ্ছে, পরিষেবার চার্জ মওকুফ করেছে। বাংলাদেশ সরকারও এক লাখ কোটি টাকা প্রণোদনা প্যাকেজ দিয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষও সাময়িক সময়ের জন্য স্টোররেন্ট মওকুফ করেছে। কিন্তু বিমানের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় নি। দীর্ঘদিন পড়ে থাকায় অনেক পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে। অনেক পণ্যের ক্ষেত্রে শুল্কের চেয়ে বেশি গুদাম ডেমারেজ এসেছে। এ অবস্থায় কোনো আমদানিকারকের পক্ষেই পণ্য খালাস নেয়া সম্ভব না।

তারা বলেন, করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে সরকার ২৬ মার্চ থেকে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করেছে। পরবর্তী সময়ে দফায় দফায় সেটি বাড়ানো হয়। এ সময় কাস্টমস সীমিত পরিসরে খোলা থাকলেও সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট, বিমান কর্মীরা নিয়মিত অফিস করেন নি। পণ্যবাহী যান চলাচলেও নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়। আবার এনবিআর থেকে আপৎকালীন সময়ে পণ্য খালাসের বিষয়ে দিক নির্দেশনা দেয়া হয়, যাতে বাণিজ্যিকভাবে আমদানি করা পণ্য খালাসে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ কারণে চাইলেই আমদানিকারকরা পণ্য খালাস নিতে পারে নি। বিমানবন্দর দিয়ে বেশি পণ্য আমদানি করেন ছোট মাঝারি আকারের আমদানিকারকরা। এর বাইরে শিল্পোদ্যোক্তারা রফতানি পণ্যের স্যাম্পল এবং অতি জরুরি পণ্য আমদানি করে থাকেন। কিন্তু এনবিআরের আদেশে বাণিজ্যিক পণ্য উল্লেখ না থাকায় ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত গুদাম ডেমারেজ গুনতে হবে। অথচ এই পরিস্থিতির জন্য ব্যবসায়ীরা দায়ী নন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে এফবিসিসিআইয়ের সহ-সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বলেন, অস্থির এই অবস্থার মধ্যে ব্যবসায়ীরা চাইলেও নানা কারণে পণ্য ডেলিভারি নিতে পারছেন না। যত দিন লকডাউন বহাল আছে তত দিন গুদাম ডেমারেজ নেয়া বন্ধ রাখা উচিত। সরকার যেখানে ব্যবসা-বাণিজ্য স্বাভাবিক করতে প্রণোদনা দিচ্ছে, সেখানে গুদাম ভাড়া নেয়ার যুক্তি নেই। তিনি আরও বলেন, এনবিআর থেকে সব ধরনের পণ্য খালাসের আদেশ দেয়া হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমরা ব্যবসায়ীদের পণ্য খালাস নিতে আহ্বান জানাচ্ছি।

বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি হেলাল উদ্দিন বলেন, বিমানবন্দর দিয়ে ছোট-মাঝারি ব্যবসায়ীরা পণ্য আনেন। এদের বেশির ভাগেরই ঢাকায় দোকান রয়েছে। সাধারণ ছুটির কারণে মার্কেট দোকানপাট বন্ধ রয়েছে। তাছাড়া পরিবহন বন্ধ এবং এনবিআর থেকে বাণিজ্যিক পণ্য খালাসে নিষেধাজ্ঞা থাকায় চাইলেও তারা মালামাল খালাস নিতে পারেন নি। এ অবস্থায় মাস খানেক পড়ে থাকা পণ্যের গুদাম ডেমারেজ দেয়া অনেকের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষকে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মতো সাময়িক সময়ের জন্য ডেমারেজ মওকুফ করে দেয়া উচিত। এতে কিছুটা হলেও ব্যবসায়ীরা করোনা বেচা বিক্রির ধকল কাটিয়ে উঠতে পারবেন।

নিয়ম অনুযায়ী, বিমান অবতরণ করার ৬ ঘণ্টার মধ্যে ওই ফ্লাইটের মালামাল কার্গো গোডাউন, ওয়্যার হাউস কিংবা ক্যানোপি এলাকায় পৌঁছাতে হয়। এর মধ্যে সংশ্লিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের কাছে মালামালের এয়ারওয়ে বিল দিতে হয়। সিঅ্যান্ডএফ কর্তৃপক্ষ এই বিলের কপি কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সসহ বিমানের কার্গো কর্তৃপক্ষকে দিলে তারা মালামাল ডেলিভারি দেবে। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে এটি অনুসরণ করতে পারছে না কোনো পক্ষই।

জানতে চাইলে ঢাকা কাস্টমস এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি এসএমএ খায়ের বলেন, করোনার কারণে সরকার ঘোষিত সাধারণ ছুটিতে কাস্টমসের কার্যক্রম সীমিত এবং যানবাহন চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকায় আমদানিকারকরা পণ্য খালাস নিতে পারেন নি। এ কারণে অনেক চালানে দেখা গেছে শুল্কের চেয়ে গুদাম ডেমারেজ বেশি আসছে। এ কারণে আমদানিকারকদের অনেকে লোকসানের আশঙ্কায় পণ্য খালাস নিতে চাচ্ছে না। আবার পণ্য পড়ে থেকেও নষ্ট হচ্ছে। তাই আপৎকালীন গুদাম ডেমারেজ মওকুফ করলে সব পক্ষই লাভবান হবে।

সামগ্রিক বিষয়ে জানতে চাইলে বিমান বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন বলেন, বিজিএমইএ ডেমারেজ মওকুফের আবেদন করেছে বলে শুনেছি। এ বিষয়ে এখনও কোনো সিদ্ধান্ত আসে নি।

নিউজ সোর্স – যুগান্তর

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!