শাহজালালে একটুর জন্য মুখোমুখি সংঘর্ষ থেকে রক্ষা দুই উড়োজাহাজের

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের পাইলট ও সিভিল এভিয়েশনের কন্ট্রোল টাওয়ারের ভুলে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ঘটতে যাচ্ছিল দুই উড়োজাহাজের মুখোমুখি সংঘর্ষ। বিমানবন্দরের রানওয়েতে যখন একটি উড়োজাহাজ অবতরণ করছিল ঠিক একই সময়ে ওই রানওয়েতে অপর একটি উড়োজাহাজ টেকঅফ (উড্ডয়ন) করছিল।

কন্ট্রোল টাওয়ারের তথ্য অনুযায়ী বিমানের পাইলটকে ‘উড্ডয়ন হোল্ড (থামা)’ করতে বলা হয়েছিল। কারণ ওই সময়ে ইউএস-বাংলার একটি উড়োজাহাজকে অবতরণের জন্য অনুমতি দেয়া হয়। কিন্তু বিমানের ফ্লাইটটি টাওয়ারের তথ্য না মেনে উড্ডয়ন শুরু করে।

অবতরণের ঠিক আগমুহূর্তে আকাশে থাকা উড়োজাহাজের পাইলটের বুদ্ধিমত্তায় এই ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পায় দুই এয়ারক্রাফট। এতে ৩শ’র বেশি যাত্রী হতাহতসহ হাজার কোটি টাকা দামের দুই এয়ারক্রাফট ক্র্যাশ হওয়া থেকে রক্ষা পায়। সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, মাত্র ৫০ সেকেন্ড এদিকে-ওদিক হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হতো শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরকে। জানা গেছে, আকাশে থাকা উড়োজাহাজটি রানওয়ে থেকে তখন মাত্র ৮-৯শ’ ফুট ওপরে ছিল।

কুয়াশার কারণে আকাশ থেকে রানওয়েও স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল না। কুয়াশা কাটিয়ে যখন ল্যান্ড করার জন্য উড়োজাহাজটি রানওয়ের ঠিক কাছাকাছি আসে তখনই দেখা যায় রানওয়ের বিপরীত দিক থেকে বাংলাদেশ বিমানের অপর একটি উড়োজাহাজ টেকঅফের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।

ওই সময়ে আকাশে থাকা পাইলট তার উড়োজাহাজ ল্যান্ড না করেই অন্যদিকে সরে গিয়ে বিমানের উড়োজাহাজকে সাইড করে দেয়। ভয়াবহ ও শ্বাসরুদ্ধকর এই ঘটনাটি ঘটেছিল ১৫ ফেব্রুয়ারি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। কিন্তু অভিযোগ সোমবার পর্যন্ত এই ঘটনায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়নি।

ব্যবস্থা নেয়া হয়নি কন্ট্রোল টাওয়ার কিংবা বিমানের সংশ্লিষ্ট কোনো পাইলটের বিরুদ্ধে। কার ভুলে এই দুর্ঘটনাটি ঘটতে যাচ্ছিল তাও নির্ধারণ হয়নি গত ৯ দিনে। বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মোকাব্বির হোসেন বলেন, তিনি বিষয়টি জানতেন না। তবে তিনি এমন চাঞ্চল্যকর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেন।

সিভিল এভিয়েশনের মেম্বার ফ্লাইট স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড রেগুলেশন (এফএসআর) চৌধুরী জিয়াউল কবির বলেন, এ ঘটনায় ৩ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। একজন সিনিয়র পাইলট, একজন কন্ট্রোলার এবং একজন আইনজ্ঞকে দিয়ে এই কমিটি গঠন করা হবে।

প্রাথমিক তদন্ত হয়ে গেছে। কন্ট্রোল টাওয়ারের আলোচনা ও দুই এয়ারক্রাফটের ব্ল্যাকবক্সের আলোচনা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হবে। দুই এয়ারক্রাফটের পাইলট ও ওই সময় কন্ট্রোল টাওয়ারে সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তারপর জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক) সূত্রে জানা গেছে, ১৫ ফেব্রুয়ারি সকালের ঘটনা এটি। এদিন সকালে কক্সবাজার যাচ্ছিল বিমানের বিজি-৪৩৩ ফ্লাইট। বোয়িং-৭৩৭ মডেলের উড়োজাহাজের ওই ফ্লাইটে পাইলট হিসেবে ছিলেন ক্যাপ্টেন মুনতাসির ও ফাস্ট অফিসার তানজিন।

টাওয়ার সূত্রে জানা গেছে, কুয়াশার কারণে আগ থেকে উড্ডয়নে নিষেধাজ্ঞা ছিল বিমানের বিজি-৪৩৩ ফ্লাইটির ওপর। শুধু বিদেশ থেকে যেসব ফ্লাইট আসছিল তাদের ল্যান্ড করার অনুমতি ছিল। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কন্ট্রোল টাওয়ারের একজন কর্মকর্তা বলেন, সকালের দিকে বাইর থেকে আসা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইট অবতরণের অনুমতি চায় টাওয়ারের কাছে।

তখন কুয়াশার কারণে রানওয়ে ঠিকমতো দেখা যাচ্ছিল না। তারপরও তারা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের ওই ফ্লাইটকে ল্যান্ড করার অনুমতি দেন। তারা মনে করছিলেন রানওয়ে তখন ক্লিয়ার, কোনো উড়োজাহাজ নেই। কিন্তু ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি যখন রানওয়ে ছুঁইছুঁই করছিল তখনই টাওয়ারে ভেসে ওঠে রানওয়েতে দৌড়ানো অবস্থায় থাকা বিমানের বিজি-৪৩৩ ফ্লাইটটির টেকঅপ। তাৎক্ষণিকভাবে তারা ইউএস-বাংলার পাইলটকে ল্যান্ড না করে ব্যাক (ফিরে যাওয়া) করার জন্য জানান।

আর এতেই রক্ষা পায় দুই উড়োজাহাজের মুখোমুখি সংঘর্ষ। টাওয়ারের ওই কর্মকর্তার মতে, যদি কোনো কারণে ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজটি ব্যাক করার সুযোগ না পেত তাহলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটত শাহজালালে। উড়োজাহাজ দুটি রক্ষা দূরের কথা কোনো যাত্রীই প্রাণে বাঁচার সুযোগ পেত না।

টাওয়ার সূত্রে আরও জানা গেছে, বিমানের বিজি-৪৩৩ ফ্লাইটটি বেশ কয়েকবার টেকঅপের (উড্ডয়নের) পারমিশন চেয়েছিল। কিন্তু তাদের পারমিশন হোল্ড (বন্ধ) ছিল। তারপরও নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে তারা কিভাবে রানওয়েতে গিয়েছে এবং টেকঅপের জন্য রানিং (দৌড়ানো) শুরু করল এটা তদন্ত হওয়া দরকার বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, টাওয়ারের পারমিশন নিয়েই তারা মুভ (দৌড়ানো) শুরু করেন। তারা যখন পূর্ণমাত্রার উড্ডয়নের অবস্থায় তখনই আকাশে উড়োজাহাজ দেখতে পান। ওই মুহূর্তে তাদের কিছুই করার ছিল না।

বিমানের পাইলটদের সংগঠন বাংলাদেশ পাইলট অ্যাসোসিয়েশনের (বাপা) সাবেক সভাপতি ক্যাপ্টেন হেলাল উদ্দিন বলেন, টাওয়ার-পাইলটের ভুল সিগনালের কারণে নেপালে ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল ইউএস-বাংলার একটি এয়ারলাইন্স। পাইলটদের ইংরেজি অনেক দেশের টাওয়ার বুঝতে পারেন না।

ডান-বাম বোঝেন না। শেষ মুহূর্তে এসে সরি… সরি… (মাফ করবেন) বলেন। তিনি বলেন, প্রায় সময় টাওয়ার থেকে পাইলটদের অস্পষ্ট ও ভুল তথ্য দেয়া হয়। অশুদ্ধ ইংরেজিতে তারা কথা বলেন। তিনি বলেন, যদি কোনো কারণে পাইলট, টাওয়ারের কথা বুঝতে না পারেন তাহলে টাওয়ারের উচিত ভালোভাবে বুঝিয়ে দেয়া।

৭৩৭-এর মতো এতবড় একটি উড়োজাহাজ টাওয়ারে দেখা গেল না কেন এটা তদন্ত করে খুঁজে বের করা উচিত। এ ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত। না হলে এ রকম ঘটনা আরও ঘটতে পারে- এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেন তিনি। সিভিল এভিয়েশনের ফ্লাইট সেফটি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, এ ঘটনায় ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ তাদের কাছে আছে। অভিযোগটি নিয়ে তারা তদন্ত শুরু করেছেন।

বিমানের ফ্লাইট অপারেশন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে সোমবার পর্যন্ত এই ঘটনায় কারও বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। দুই পাইলট সোমবারও ফ্লাইট পরিচালনা করেছেন। এ বিষয়ে জানতে বিমানের ওই ফ্লাইটের পাইলট ক্যাপ্টেন মুনতাসিরের সঙ্গে টেলিফোনে যোগাযোগ কার হলেও তার মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

নিউজ সোর্স – সময় নিউজ

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!