লোকসানে ডানা ভাঙা দেশিয় বিমানসংস্থাগুলো

আকাশপথে যাত্রী পরিবহন বাড়ছে। আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট বেড়েছে। দেশের মধ্যে সড়ক ও নৌপথে নিয়মিত চলাচলকারী যাত্রীদের অনেকে এখন আকাশপথে যাচ্ছেন। তবু এয়ারলাইনস ব্যবসা ঝুঁকিতে। চালুর কয়েক বছরের মধ্যে আটটি এয়ারলাইনস তাদের ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে। তিনটি বেসরকারি এয়ারলাইনস এখনো টিকে আছে।

রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস জ্বালানি বকেয়া পরিশোধ করতে পারছে না। ঋণে কেনা এয়ারক্রাফট থেকেও লাভ করা যাচ্ছে না আশানুরূপ হারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশীয় এয়ারলাইনস ব্যবসা বেশ ঝুঁকির মুখে পড়েছে। অথচ আকাশপথে দিন দিন যাত্রীসংখ্যা বাড়ছে।

একই সঙ্গে বাড়ছে ফ্লাইটের সংখ্যাও। আগে যেখানে দিনে একটি ফ্লাইটও চলত না, সেখানে চলছে ১০-১২টি ফ্লাইট। উড়োজাহাজ পরিচালনা সংস্থাগুলোর হিসাবে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে উড়োজাহাজে যাত্রী পরিবহনের বাজার প্রায় ৪ বিলিয়ন ডলারের। এই বাজারের ২০-২২ শতাংশ মাত্র দেশি উড়োজাহাজ সংস্থার দখলে, বাকি ৭৭-৭৮ শতাংশই বিদেশি উড়োজাহাজের প্রতিষ্ঠানের হাতে।

স্বাধীনতার পর চালু হয় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস। ১৯৯৫ সালে বেসরকারি এয়ারলাইনস ব্যবসা শুরু করে। বিভিন্ন সময়ে লাইসেন্স পাওয়া ১১ প্রতিষ্ঠানের মধ্যে তিনটি এখন টিকে আছে। ইউএস-বাংলা, নভোএয়ার এবং রিজেন্ট এয়ারওয়েজ। বাকিগুলো বন্ধ হয়ে

গেছে। অথচ আকাশপথে বিদেশে যাতায়াতকারীদের চার ভাগের এক ভাগ অভ্যন্তরীণ রুটে চলাচল করেন। তবে যাত্রীর সংখ্যা আগের তুলনায় বাড়ছে। অভ্যন্তরীণ রুটে ফ্লাইট পরিচালনা করছে বিমানসহ চারটি বিমান সংস্থা। ২০১৮ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে ৪৬ হাজার ৯৮৮টি ফ্লাইট যাতায়াত করে। যার বেশিরভাগই বেসরকারি সংস্থার। তদুপরি লাভের বদলে কেন লোকসান হচ্ছে; আর কী কারণে ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো সেই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে।

এভিয়েশন খাতের সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১২-১৩ সালে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী ছিল সাড়ে ৬ লাখ, ২০১৫ সালে বেড়ে হয় সোয়া ৯ লাখ। ২০১৭ সালে যাত্রী বেড়ে হয় সাড়ে ১২ লাখ। ২০১৯ সালে অভ্যন্তরীণ রুটে যাত্রী ছিল ১৮ লাখ ২১ হাজার। এ হিসাবে দেখা গেছে, অভ্যন্তরীণ রুটে ৬ বছরে যাত্রী বেড়েছে তিন গুণের বেশি। এসব যাত্রীর ৮০ শতাংশই বহন করেছে বেসরকারি উড়োজাহাজ সংস্থা।

এভিয়েশন খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০১৮ সালে দেশের বিমানবন্দর থেকে প্রায় এক কোটি যাত্রী দেশে-বিদেশে যাতায়াত করেন। এর মধ্যে বিদেশে যাতায়াত করা যাত্রী ছিলেন ৮২ লাখ ৬৫ হাজার। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে অভ্যন্তরীণ রুটের যাত্রী ছিলেন ১৮ লাখ ২১ হাজার। তার মানে আকাশপথে যাত্রী চাহিদা ব্যাপক। দেশের এয়ারলাইনস ব্যবসা প্রতিযোগিতায় টিকতে না পারলে বাজার দখল করবে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। যাত্রী পরিবহন কিন্তু বন্ধ হবে না।

এ জন্য উদ্যোগী হতে হবে সরকারি-বেসরকারি উভয় পক্ষকেই। এয়ারলাইনস ব্যবসায় প্রথমত গুরুত্ব দিতে হবে দক্ষ ব্যবস্থাপনাকে। উড়োজাহাজ কেনা ও গন্তব্য বাছাই করার সঙ্গে ব্যবসায় লাভ-ক্ষতির বিষয় সম্পৃক্ত।

এ ছাড়া বলা হয় উড়োজাহাজের জ্বালানি জেট ফুয়েলের দাম তুলনামূলক বেশি; মেরামতের জন্য বিমানবন্দরে পর্যাপ্ত হ্যাঙ্গারের ব্যবস্থা না থাকা, অতিরিক্ত অ্যারোনটিক্যাল চার্জ এবং যন্ত্রাংশের আমদানি জটিলতা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও এসব বিষয় তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে অ্যারোনটিক্যাল চার্জ কমানোর আপাতত সম্ভাবনা না থাকলেও জেট ফুয়েলের দর কমাতে জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে আরেকটি বৈঠক করার কথা রয়েছে। সেখানে বিষয়টি তুলে ধরা হবে। হ্যাঙ্গারের সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ। বিমান মেরামতে যন্ত্রাংশ আমদানির দীঘসূত্রতা কমাতে কাস্টমস বিভাগের সহায়তা চেয়েছেন এয়ারলাইনস ব্যবসায়ীরা।

বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মহিবুল হক এ বিষয়ে বলেন, দেশের সব কটি বিমানবন্দরের মধ্যে একমাত্র ঢাকার হযরত শাহজালাল বিমানবন্দর লাভে আছে। বাকিগুলো চলছে লোকসানে। অথচ জনবল, যন্ত্রপাতিসহ বিপুল অর্থ খরচ হয় একটি বিমানবন্দর পরিচালনায়। একমাত্র আয়ের উৎস অ্যারোনটিক্যাল চার্জ হওয়ায় তা কমানো যাচ্ছে না। জ্বালানির দাম কমানোর বিষয়টি অন্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে। উড়োজাহাজ মেরামতে বিমানবন্দরের উত্তর দিকে আরও ৬-৭টি হ্যাঙ্গার নির্মাণ করা হচ্ছে। এক বছরের মধ্যে এর সমাধান হয়ে যাবে।

এভিয়েশন খাতের কর্মীরা জানান, নির্দিষ্ট সময় পর পর উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয়। বিমানের ইঞ্জিন ও ল্যান্ডিং গিয়ারসহ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ মেরামত করতে হয়। এর একটি হলো সি-চেক। বাংলাদেশ বিমান ছাড়া অন্য এয়ারলাইনস সি-চেক করতে বিড়ম্বনায় পড়ে। কারণ শাহজালাল বিমানবন্দরে বিমানের ছাড়া অন্য প্রতিষ্ঠানের হ্যাঙ্গার নেই। তাই হ্যাঙ্গারের জন্য লাইন থাকে। আটটি বিদেশি ও সাতটি দেশি গন্তব্যে যাত্রী নিয়ে উড়ে যাচ্ছে বেসরকারি উড়োজাহাজ। এ জন্য এয়ারক্রাফট বসিয়ে রাখা মানে লোকসান।

তবে বেবিচক কর্মকর্তারা জানান, দুই বছর আগে হ্যাঙ্গার তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। আগামী এক থেকে দেড় বছরের মধ্যে এর সমাধান হতে পারে। আর ল্যান্ডিং চার্জ কমালে বিমানবন্দরের আয় বন্ধ হয়ে যাবে। তবে জ্বালানির দাম কমাতে জ্বালানি বিভাগকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকের মাধ্যমে সমাধানের সুযোগ আছে। যাতে পৃথিবীর অন্যান্য দেশের জ্বালানি হার পর্যালোচনা করে আরও সহনীয় করা যায়।

দেশে প্রথম বেসরকারি এয়ারলাইনস হিসেবে লাইসেন্স পায় অ্যারো বেঙ্গল এয়ারলাইনস। ১৯৯৭ সালে তারা যাত্রী পরিবহন শুরু করে। এক বছরও সেটি টেকেনি। এর পর একে একে বন্ধ হয়ে যায় জিএমজি এয়ারলাইনস, এয়ার পারাবাত, এয়ার বাংলাদেশ, জুম এয়ারওয়েজ, বেস্ট এয়ার, ইউনাইটেড এয়ার ও রয়েল বেঙ্গল এয়ারলাইনস। অব্যাহত লোকসানের মুখে ডানা মেলতে পারেনি এসব বিমান সংস্থা।

এর পেছনে গন্তব্য নির্ধারণ ও উড়োজাহাজ কেনার পছন্দের ভুলও থাকতে পারে। মানে কোনো সাশ্রয়ী ও যাত্রীবান্ধব উড়োজাহাজ কেনার পরিবর্তে অতিরিক্ত জ্বালানিখেকো উড়োজাহাজ কেনায় ঠকেছেন অনেকে। আছে চাহিদাভেদে গন্তব্য নির্ধারণের বিষয়। বিপুল বিনিয়োগ করেও এ ক্ষেত্রে ভুল করলে ব্যবসায় টেকা কঠিন। তাই ব্যবস্থাপনার ত্রুটি ও পরিকল্পনার ঘাটতি এয়ারলাইনস ব্যবসা বন্ধের দিকে নিতে পারে।

এ নিয়ে ইউএস-বাংলার জনসংযোগ কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম বলেন, দেশীয় এয়ারলাইনস ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব সরকারের। হ্যাঙ্গার, অ্যারোনটিক্যাল চার্জ, জেট ফুয়েলসহ বিদ্যমান সমস্যা সমাধান না হলে মুখ থুবড়ে পড়তে পারে এয়ারলাইনসগুলো। পৃথিবীর সব দেশই নিজ দেশীয় বিমান সংস্থাগুলোর চার্জ কম নিয়ে থাকে, আমাদের উল্টো। এখানে চার্জ এত বেশি যে সব দিয়ে কোনো দিন লাভের মুখ দেখা যাবে না।

নিউজ সোর্স – দৈনিক আমাদের সময়

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!