বিমান ও বিমানবন্দর : সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়

বৈশ্বিক করোনা পরিস্থিতির কারনে বংলাদেশ বিমানের আন্তর্জাতিক এবং অভ্যন্তরীণ সকল গন্তব্যে ফ্লাইট পরিচালনা এখন সম্পূর্নরুপে বন্ধ । সকল বিদেশী বিমান সংস্থাও বাংলাদেশে তাদের শিডিউল ফ্লাইট পরিচালনা বন্ধ রেখেছে।

ব্যতিক্রম শুধু চীন দেশ । তাদের কয়েকটি এয়ারলাইন্স এখনো নিয়মিত বাংলাদেশে যাত্রী এবং কার্গো পরিবহন করে । দ্বিপাক্ষিক জরুরী স্বার্থ সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ কারনেই হয়তো এসব বিমান এখনো পরিচালিত হচ্ছে ।
পাশাপাশি বাংলাদেশে অবস্থানরত বিদেশী কুটনৈতিক মিশনগুলো ভীতসন্ত্রস্ত হোক বা তাদের রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তেই হোক তারা তাদের পরিবারবর্গ এবং লকডাউনে আটকেপরা নাগরিকদের স্বদেশে ফিরিয়ে নিতে প্রতিদিনই ১ টা ২ টা চার্টার্ড বিমান পরিচালনা করছে।

গ্রাহক সেবার দায়িত্বে নিয়োজিত ডেডিকেটেড বিমান কর্মীরা চেকিং বোর্ডিং , ব্যাগেজ মেকআপ-ডিলিভারী , হুইল চেয়ার ইত্যাদি প্রয়োজনীয় গ্রাহক সেবা অহর্নিশ প্রদান করে যাচ্ছে। কখনো সকাল , কখনো দুপুর ,কখনোবা রাত।

আগমনী বা বহির্গামী এসব যাত্রীবাহী ননসিডিউল এবং কার্গোবাহী উড়োজাহাজ লোড আনলোডের সকল প্রয়োজনীয় জরুরী সেবা দিচ্ছেন গ্রাউন্ড সাপোর্ট ইকুইপমেন্ট ডিপার্টমেন্টের সংশ্লিষ্ট বিমান কর্মীরা।

দৈনিক ৪/৫ টি কার্গো ফ্লাইটের মালামাল প্রেরণ এবং ডেলিভারীতে নিয়োজিত রয়েছে কার্গো এক্সপোর্ট ইমপোর্ট বিভাগের কর্মচারীরা । জাতির এ দু:সময়ে সময়ে তাদের ভূমিকা অপরিসীম এবং প্রশংসনীয় । কেননা তাদের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় করোনা যুদ্ধের প্রয়োজনীয় মালামাল , ঔষধ , চিকিৎসা সামগ্রী বা তার কাঁচামাল অতিদ্রুত ডেলীভারী দেয়া সম্ভব হচ্ছে।

বাংলাদেশ বিমানের বহরের সবকটি নিজস্ব উড়োজাহাজের নিয়মিত রক্ষনাবেক্ষণসহ ননশিডিউল যাত্রীবাহী এবং কার্গো উড়োজাহাজের বাধ্যতামূলেক নিয়মিত অপরিহার্য সেবা প্রদান করে যাচ্ছে প্রকৌশল বিভাগের কর্মীরা।

উড়োজাহাজ পরিচালনা বন্ধ থাকায় উৎকন্ঠিত গ্রাহক যাত্রীদের বিভিন্ন হাজারো প্রশ্নের সমাধান দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কলসেন্টারে কর্মরত বিমান কর্মীরা।

লকডাউনের এই উৎকন্ঠিত সময়ে স্বল্প সংখ্যক বিমান কর্মীরা যে যেখানেই কাজ করুক না কেন প্রত্যেকেই করোনা সংক্রমনের ভয় এবং উৎকন্ঠা নিয়ে ঝাঁকিপূর্ণ অফিস জীবন কাটাচ্ছে । শুধু নিজে নয় , তার মাধ্যমে তার পরিবারের সদস্যরা কোন ভাবে সংক্রমিত হয়ে পরে কিনা সেটাও মানসিকভাবে তাকে বিপর্যস্ত করে তুলছে ।

এসব বিমান কর্মীদের সুরক্ষা ব্যবস্থা কি পর্যাপ্ত ? ন্যুনতম তো সুরক্ষা সামগ্রী যে পাচ্ছে না তা অস্বীকার করা যাবে না । কিছু বিমান কর্মী এমন ভাবে ফেসবুকে লিখেন যে তিনি কিছুই পান নি । যদিও এসব লেখক অধিকাংশই ছুটিতে হোম কোয়ারেন্টাইনে আছেন । যাই হোক, তর্কে যেতে চাই না । কেননা এখন তর্ক করার সময় না ।

কিছু মাস্ক বা হ্যান্ড গ্লোভস সেকশনে সেকশনে থোক বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে যা অপ্রতুল । এভাবে থোক বরাদ্দ দিয়ে সকলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না । এ পদ্ধতিতে কেউ পায় , কেউ পায় না। আবার বন্টনকারী তার নিজস্ব ভান্ডারে কিছু রক্ষিত রেখে চিরাচরিত বাঙালী চরিত্রের প্রকাশ ঘটায়। কর্মরত প্রত্যেক কর্মকর্তা, শ্রমিক , কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন অতীব জরুরী । বিষয়টি এখন সময়ের দাবী ।

বিমান কর্মীদের যে কাজের ধরন সেখানে সোস্যাল ডিস্ট্যান্স মেন্টেন করা মোটেও সম্ভব না। যাত্রীর সন্নিকটে যেতে হয় , কথা বলতে হয় , কখোনা অসুস্থ বা শারীরিক ভাবে হাটতে অক্ষম এমন যাত্রীর ব্যাগেজও বহন করতে হয় , কোলে করে তুলতে হয় । আগত বিদেশী ফ্লাইটের ক্রুদের সন্নিকটে যেতে হয় । জাহাজ লোড আনলোডে নিয়োজিত সুপারভাজর, লোডমাস্টার, জিএসই অপারেটরদের পরস্পরের মুখের কাছে গিয়ে কথা বলতে হয়। কেননা জাহাজের ইঞ্জিনের বিকট শব্দে পরস্পরকে শুনা যায় না । ব্যাগেজ , ভারী মালামাল , কার্গো দুই তিনজনে মিলে এক সাথে লিফ্ট এন্ড ডাউন করতে হয় । এয়ারওয়ে বিল , ট্যাগ চেকিং , ভাউচার , কার্গো ডেলিভারি ইত্যাদি কর্মযজ্ঞের সাথে জড়িত কর্মচারীরা গায়ের সাথে গা লেগে কাজ করতে হয় । কার্গো ইমপোর্টতো লোকে গিজগিজ করে । হ্যাঙ্গারে ইঞ্জিনের বা জাহাজ রক্ষনাবেক্ষনের কাজ গায়ে গায়ে মিলেই করতে হয় । এজন্য পরিপূর্ণ পারসোনাল প্রটেকশন ইকুইপমেন্ট (পিপিই ) অতীব জরুরী।

IATA গাইডলাইনে কোভিড ১৯ নিয়ে কি লিখেছে বা তা এ দেশের জন্য কতোটুকু প্রযোজ্য তা নিয়ে প্রশ্ন রয়ে যায় । যদিও আমরা আমাদের নিজস্ব সুবিধা এবং ইচছানুযায়ী IATA ‘র ফরমূলা গ্রহন বা বর্জন করি ।

বর্তমানে বাংলাদেশ বিমান কর্মীরা যাদের সাথে হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে কাজ করে অর্থাৎ অন্যান্য প্রত্যেকটি বিদেশী এয়ারলাইন্স , দেশী এয়ারলাইন্স (ইউএসবাংলা ) সিভিল এভিয়েশন, আনসার , পুলিশ সকলেই কমপ্লিট পিপিই পরিধান করে নির্বিঘ্ন সেবা প্রদান করেতেছেন। এ জন্য বিমান কর্মীদের সুরক্ষায় পিপিই’র প্রয়োজনীয়তাটা আরো বেশী গুরুত্ব হয়ে উঠেছে ।

সবশেষ কথা , এখনো কর্তৃপক্ষ যদি যুক্তি খুঁজেন যে, বিমান কর্মীর পিপিই লাগবে কিনা তা হলে চরম ভুল হবে । এক সময় বলেছিলেন মাস্ক প্রয়োজন নেই , মাস্ক পরবে শুধু করোনা রোগী। আর এখন ? সে চিত্র তো সবার জানা । দু:খ এই যে, আমরা সব কাজই করি , তবে যথা সময়ে করি না ।

আল্লাহ না করুক, যদি কোন বিমান কর্মী করোনায় আক্রান্ত হন তাহলে ঐ বিমান কর্মীর ভাগ্যে কি আছে তা জানি না , কিন্তু বিমানের ঐ সেকশন কি লকডাউন হবে না ? অফিসের যে গাড়ীতে আক্রান্ত ব্যক্তিকে পরিবহন করা হয়েছে ঐ গাড়ীতে যারা যাওয়া আসা করেছেন সে সকল বিমান কর্মীদের লকডাউন বা হোম কোয়ারেন্টাইনের আওতায় আসতে হবে না ?

খবরটি কি জাতীয় সংবাদ শিরোনাম হবে না? ব্যবসায় প্রভাব পরবে না? করোনা ব্যবস্থাপনায় নিয়োজিত প্রশাসন কি বিমানকে খাতির করবে? মোটেও না।

মনে রাখতে হবে চট্টগ্রামের দাম পারায় একজন পুলিশ সদস্য করোনা পজেটিভ হওয়ায় তার সকল সহকর্মীসহ ঐ এলাকা এখন লকডাউনে আবদ্ধ। আর দেরী নয় । সারা দেশ এখন ঝুঁকিপূর্ণ, বিমান বন্দর তার চেয়েও বেশী মারাত্বক ঝুকিপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কর্মরত সংশ্লিষ্ট বিমান কর্মীদের পরিপূর্ণ পিপিই সরবরাহ করতে হবে , অন্যদের নয়। এখন খরচ নিয়ে ভাবনা পরিত্যাগ করতে হবে এবং ভবিষ্যতে যাতে বড় ক্ষতি না হয় সে চিন্তা মাথায় রেখে স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আমাদের খরচ বাড়াতে হবে।

আশাকরি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দয়া করে গুরুত্বের সাথে বিষয়টি আমলে নিবেন । কেননা সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড় ।

সবাই ভাল থাকুন , সুস্থ থাকুন। এ লেখাটি ঘরে বসে সস্তা সেন্টিমেন্টের কোন ফেসবুক স্ট্যাটাস নয়। এই ক’দিন সরেজমিন দেখে বিমান কর্মীদের উৎকন্ঠিত আবেগের চিত্রটাই তুলে ধরলাম।

উপরোক্ত লেখাটি বিমান শ্রমিক লীগ (সিবিএ) প্রেসিডেন্ট জনাব মশিকুর রহমান সাহেবের ফেসবুক পেইজ থেকে হুবহু তুলে ধরা হলো।

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!