বিপণিবিতানে সবই আছে, নেই শুধু ক্রেতা

টিকাটুলির মোড়ে মহানগর সুপার মার্কেটের সামনের ফটক আজ মঙ্গলবার খুলেছে প্রায় পৌনে দুই মাস পর। ফটকের সামনে বেশ বড় আকারে টিনের ট্রের মধ্যে জীবাণুনাশক পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়েছে লাল রঙের পাপোশ। এই লালগালিচা সংবর্ধনা ক্রেতাদের জন্য। পাপোশে জুতো মুছে ভেতরে প্রবেশ করলেই দেখা পাওয়া যাবে স্প্রে মেশিন নিয়ে অপেক্ষমাণ নিরাপত্তাকর্মীর। তিনি বিনয়ের সঙ্গে অভ্যাগতদের বলছেন একটু অপেক্ষা করতে। সারা গায়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করে দেবেন। ক্রেতারা আপত্তি না করলে স্প্রে করে দিচ্ছেন।

ঢাকার দক্ষিণ প্রান্তের একটি বিশাল বিপণিবিতান এই মহানগর সুপার মার্কেট। মার্কেটের ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৩৯ নম্বর ওয়ার্ডের কমিশনার মঈনুল হক বর্তমানে জেলে অবস্থান করছেন অস্ত্র এবং অন্যান্য মামলায়। তাঁকে গ্রেপ্তার করায় কমিটি ভেঙে গেছে। আজ দুপুরে মার্কেটের কার্যালয়ে গিয়ে পাওয়া গেল অফিস সহকারী ইউনুস গাজীকে। তিনি জানালেন, ১৯৯৫ সালে নির্মাণ শেষ হয়। এর পরপরই বিপণিবিতানটি চালু হয়েছে। এখানে দোকানের হোল্ডিং নম্বর আছে ১ হাজার ৭৮৩টি। গত ২৪ মার্চ থেকে করোনার সংক্রমণের কারণে বন্ধ ছিল। জেলা প্রশাসনের অনুমোদন নিয়ে আজ থেকেই মার্কেট খোলা হয়েছে।

মূলত মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের প্রচুর সমাগম ঘটে এই বিশাল আকারের বিপণিবিতানে। মার্কেটে ঘুরে দেখা গেল, পোশাক, প্রসাধনী, পর্দার কাপড়, অলংকার, ক্রোকারিজ, খেলনাসহ সংসারের প্রয়োজনীয় প্রায় সব রকমের দ্রব্যই আছে এই বিপণিবিতানে। তবে লম্বা বন্ধের পর খোলার প্রথম দিনে ক্রেতা বিশেষ ছিল না। দীর্ঘদিন পর দোকান খুলে মালিক-কর্মচারীরা মূলত ভেতরে জমে ওঠা ধুলা–ময়লা পরিষ্কার–পরিচ্ছন্ন করে র‍্যাকগুলোতে মালামাল সাজাতেই ব্যস্ত ছিলেন।

তৈরি পোশাকের দোকান আপনান ফ্যাশনের বাচ্চাদের ফ্রক যাচাই–বাছাই করছিলেন গৃহবধূ সাবিনা ইয়াসমিন। থাকেন ধলপুরে। গুলিস্তান এলাকায় এসেছিলেন ওষুধ কিনতে। যাওয়ার পথে মহানগর মার্কেট খোলা পেয়ে মেয়ের জন্য পোশাক কিনতে এসেছেন।

কথা হলো এই মার্কেটের প্রসাধনীর দোকান অল কালেকশনের মালিক মো. মাসুম, ইমিটেশনের অলংকারের দোকান বিডি গ্ল্যামারের মালিক দিন মোহাম্মদসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তাঁরা জানালেন, এটি বেশ চালু মার্কেট। তবে সবাই জানেন বন্ধ। মার্কেট আবার খুলেছে জেনে গেলেই এক–দুই দিনের মধ্যেই ক্রেতারা চলে আসবেন। রোজার সময় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখার সময়টি অনেকের পছন্দ হয়নি। রোজার সময় দিনের বেলা স্বাভাবিক সময়েই ক্রেতা কম থাকে। বিকেল থেকে সন্ধ্যার পর বেচাকেনা বেশি হয়। তাঁদের মতে, বেলা ৩টা থেকে রাত ৯টা বা ১০টা পর্যন্ত মার্কেট খোলা রাখা হলে ভালো হতো।

এর পাশেই বেশ কয়েকটি বহুতল ভবনের আধুনিক বিপণিবিতান গড়ে উঠেছে। তারই একটি চৌধুরী মল। এখানেও ক্রেতা অল্পই। থান কাপড়ের দোকান ঢালী বস্ত্রালয়ের মালিক মেহেদি হাসান বললেন, মার্কেট বন্ধ হয়েছিল ১৮ মার্চ, খুলেছে ১০ মে। ঈদ সামনে রেখে অনেক কাপড় তুলেছিলেন। ক্রেতাই নেই, এখন সামনের দিনগুলোতে কী হবে, পুরো অনিশ্চিত পরিস্থিতি। ক্রেতার অপেক্ষায় দিন গুনছেন তাঁরা।

টিকাটুলী থেকে যাত্রাবাড়ী চৌরাস্তায় গিয়ে দেখা গেল প্রচুর যানবাহন। এই মোড়ের দক্ষিণেই প্রশস্ত শহীদ ফারুক সড়ক। যাত্রাবাড়ীর প্রধান বিপণিবিতানগুলো এই সড়কের দুই পাশে। সড়কটি নানা রকম যানবাহনে ঠাসা। দোকানপাটও খুলেছে। ফুটপাত দিয়ে হকাররা হরেক পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন। ফিরে এসেছে করোনার সংক্রমণের জন্য লকডাউনের আগের পরিস্থিতি।

যাত্রাবাড়ীর এই অবস্থা ছিল আজ দুপুরের দিকে। ২৪ মার্চ বন্ধ হওয়ার পর ১০ মে রোববার থেকে এই এলাকার বিপণিবিতানগুলো খুলে গেছে। ফুটপাত দিয়ে হকারদের পসরা অবশ্য বসতে শুরু করেছিল সপ্তাহখানেক আগেই। এখানকার সবচেয়ে বড় বিপণিবিতান ইদ্রিস সুপার মার্কেট। প্রধান প্রবেশপথের সামনেই দেখা গেল, দুজন নিরাপত্তাকর্মী আগত ক্রেতাদের গায়ে জীবাণুনাশক স্প্রে করে ও হাতে স্যানিটাইজার মাখিয়ে দিচ্ছেন।

ভেতরের দোকানগুলোতেও বিক্রেতারা ক্রেতাদের ফাঁকে ফাঁকে দাঁড়াতে বলছিলেন। কলেজপড়ুয়া মেয়ে মেহেরুন্নেসাকে নিয়ে কেনাকাটা করতে এসেছিলেন উত্তর যাত্রাবাড়ীর ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী। তিনি বললেন, স্বাস্থ্যবিধি মানার এই ব্যবস্থা তাঁর পছন্দ হয়েছে। সামনের দিনগুলোতে ভিড় বাড়বে। তখনো যদি এই ব্যবস্থা চালু থাকে, তাহলে ভালো হবে। এখন ভিড় একটু কম। তাই তিনি আগে আগেই ঈদের কেনাকাটা করতে চলে এসেছেন।

এই মার্কেটের তৈরি পোশাকের দোকান মাহিন-মীম বস্ত্রালয়ের ব্যবস্থাপক আবদুল কাদের, জুতোর দোকান ইন্ডিয়ান গ্যালারির মালিক সালমান আহমেদ, লুঙ্গির দোকান নাদিম লুঙ্গি হাউসের মালিক মো. সাগরসহ বেশ কয়েকজন ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, ঈদের বেচাকেনা এখনো তেমন শুরু হয়নি। এখানেও সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মার্কেট খেলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছে। লোকজনের উপস্থিতি খুব কম। করোনার আতঙ্ক মানুষের মন থেকে যায়নি। সে কারণে তাঁরা ঘর থেকে বের হচ্ছেন না। অনেক দোকানি জানালেন, তাঁরা গতকাল সোমবার বউনিই করতে পারেননি।

পাশেই তাজ সুপার মার্কেট। এখানে পোশাকের দোকান ব্যাপারী ফ্যাশন হাউসের বিক্রেতা মো. নয়ন জানালেন, গতকাল দুপুর পর্যন্ত তাঁর দোকানে বিক্রিই হয়নি। আগের দিনে মাত্র ২ হাজার ৬০০ টাকার বিক্রি হয়েছিল। তবে বিক্রি যা–ই হোক বা না হোক, টানা দেড় মাসের বেশি সময় পর দোকান খুলতে পেরে তাঁরা স্বস্তি ফিরে পেয়েছেন। বন্ধের দিনগুলো যেন আর কাটতেই চাইছিল না। বিশেষ করে দোকান কর্মচারীরা প্রচণ্ড অর্থকষ্টে ছিলেন। কেউ বেতন পাননি, কেউ পেয়েছেন অর্ধেক। খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছিল তাঁদের। যাত্রাবাড়ীর অন্য বিপণিবিতানের মধ্যে রয়েছে শামসুদ্দিন সুপার মার্কেট, সামাদ সুপার মার্কেট, তাজ মার্কেট, রহমান প্লাজা—এসব। এগুলোতেও ঘুরেফিরে দেখা গেল, ক্রেতার সংখ্যা খুব কম। নেই বললেই চলে। তবে প্রায় প্রতিটি মার্কেটের সামনেই জীবাণুনাশক স্প্রে করা বা হাতে স্যানিটাইজার দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আর বিক্রেতারা অপেক্ষা করছেন ক্রেতাদের জন্য, কবে তাঁদের সমাগমে বিপণিবিতানগুলো আবার সরগরম হয়ে উঠবে।

প্রথম আলো

Source Link

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!