নভোএয়ার – বাংলাদেশের সেরা ডোমেস্টিক এয়ারলাইন্স!

নভোএয়ার কি আসলেই বাংলাদেশের সেরা ডোমেস্টিক এয়ারলাইন্সের একটি? কিসের ভিত্তিতে এই কথা বললাম? চলুন আজকে নিজের পার্সোনাল এবং পাবলিক এক্সপেরিয়েন্স একত্র করে নভোএয়ার নিয়ে কিছু গবেষণা করবো। এবং তুলে ধরবো নভোএয়ারে ফ্লাই করার সেরা ১০ কারণ।

২০০৭ সালের অক্টোবরে প্রতিষ্ঠিত হলেও নভোএয়ার প্রথম কমার্শিয়াল ফ্লাইট চালু করে ০৯ জানুয়ারি ২০১৩ থেকে। প্রথমদিকে ব্রাজিলিয়ান এম্ব্রায়ার কোম্পানির Embraer 145 jet দিয়ে ফ্লাইট অপারেট করা হত। আমার সৌভাগ্য হয়েছিলো এই ছোট জেট ফ্লাইটে চড়ার! আহা কি স্মুদ, পুরা মাখনের মত ফ্লাইট! জেট ইঞ্জিন যেহেতু সাউন্ড ও ছিলো অনেক কম। পরবর্তীতে এই ফ্লাইটগুলো চেঞ্জ করে ATR 72-500 প্রপেলার এয়ারক্রাফট নিয়ে আসা হয়। এর পিছে অবশ্য অতিরিক্ত জ্বালানি খরচ, এবং টিকেটের দাম কমানোই মূল কারণ ছিলো, যেহেতু বেশি দাম দিয়ে আমরা কেউই ডোমেস্টিক ফ্লাইটে চড়তে চাইনা।

নভোএয়ার জেট
Novoair Jet. Source: Shadman Samee / Flickr

নভোএয়ার একেবারে মনে প্রাণে অভ্যন্তরীণ বিমান। এই কথা বলার কারণ হলো একমাত্র কলকাতা ছাড়া নভোর আন্তর্জাতিক কোন ফ্লাইট নেই। আর কলকাতা তো বাংলা ভাষাভাষীদেরই শহর! এবার চলুন দেখে আসি ডোমেস্টিক ফ্লাইটে নভোএয়ারকে এক নাম্বার দেওয়ার প্রধান ১০ টি কারণ।

১। দেশের প্রথম frequent flyer প্রোগ্রাম

যারা বিমানে রেগুলার ফ্লাই করেন তাদের প্রায় সবাই ফ্রিকুয়েন্ট ফ্লায়ারের ব্যাপারে অবগত আছে। কেউ যদি কোন নির্দিষ্ট বিমানে রেগুলার ফ্লাই করেন, তাহলে তাকে ওই বিমানে frequent flyer বলা হয়। এখন বিমান কোম্পানিগুলো তাদের এমন আন্তরিক এবং বিশ্বস্ত প্যাসেঞ্জারদের জন্য frequent flyer প্রোগ্রামের ব্যবস্থা রাখে, যেখানে নিয়মিত ফ্লাই করে প্যাসেঞ্জার অনেক রকম গিফট অথবা ফ্রি টিকেট পেতে পারেন এয়ারলাইন্সের পক্ষ থেকে।

নভোএয়ার বাংলাদেশের প্রথম বিমান কোম্পানি, যারা তাদের এমন প্যাসেঞ্জারদের জন্য Smiles নামে frequent flyer প্রোগ্রাম চালু করে। নিয়মিত ফ্লায়ারদেরকে ফ্রি টিকেট ছাড়াও এক্সেস ব্যাগেজ, প্রায়োরিটি চেকিন, পছন্দমত সিট সহ অনেক সুবিধা দেয় নভোএয়ার।

২। টপ প্যাসেঞ্জার সার্ভিস

নভোএয়ারে বহরে বড় কোন ফ্লাইট নেই। সব হলো ৬৮ সিটের এটিআর ৭২-৫০০ (ATR 72-500)। যেহেতু প্যাসেঞ্জার কম, তাই ব্যাগেজ লোড-অফলোড করতে খুব বেশি সময় লাগেনা। চেকিন প্রসেস ও খুব তাড়াতাড়ি শেষ করা হয়। ফুল চেকিন কমপ্লিট হয়ে যাওয়াতে নির্দিষ্ট সময়ের আগে ফ্লাইট ছেড়ে গেছে এমন নজিরও আছে।

এছাড়াও আন্তর্জাতিক রুটের প্যাসেঞ্জার হলে রেগুলার ২০ কেজির বাইরে আরো ১০ কেজি, মানে টোটাল ৩০ কেজি ব্যাগেজ প্রোভাইড করে নভো।

৩। দেশের সবপ্রান্তে ফ্লাইট!

নভোএয়ার দেশের সব এয়ারপোর্টেই ফ্লাইট অপারেট করে। ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গ, দক্ষিণ সবখানেই ফ্লাইট আছে। নিচে নভোএয়ার ঢাকা থেকে কোথায় কোথায় ফ্লাইট অপারেট করে তা লিস্ট আকারে দেওয়া হলো।

  • চট্টগ্রাম – শাহ্‌ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
  • সিলেট – ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
  • কক্সবাজার – কক্সবাজার বিমানবন্দর
  • রাজশাহী – শাহ্‌ মাখদুম বিমানবন্দর
  • যশোর – যশোর বিমানবন্দর
  • বরিশাল – বরিশাল বিমানবন্দর
  • সৈয়দপুর – সৈয়দপুর বিমানবন্দর
  • কলকাতা (আন্তর্জাতিক) – নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বোস বিমানবন্দর

এইসব রুটে অতিরিক্ত যাত্রী সেবা দিতে মাঝে মাঝে স্পেশাল ফ্লাইটের ব্যবস্থা করা হয়। যেমন ডিসেম্বরে যাত্রীচাপ বাড়াতে কক্সবাজারে ডেইলি প্রায় ৬ টি ফ্লাইট অপারেট করে নভো। ডেইলি গড়ে সব রুটে ২৫ টি ফ্লাইট অপারেত করে নভোএয়ার।

৪। স্মার্ট বিমানবালা!

আমার দেখা সবচাইতে প্রফেশনাল এবং স্মার্ট কেবিন ক্রু নভোএয়ারের। আমি বাংলাদেশ এবং ইন্ডিয়ার প্রায় সব ডোমেস্টিকে ফ্লাই করেছি। নভোএয়ারের মত আন্তরিক কেবিন ক্রু খুব কমই পেয়েছি। সারাক্ষণ মুখে সুন্দর হাসি লেগে থাকে এদের! যদিও কেবিন ক্রু এর জন্য কেউ ফ্লাই করেনা, তারপরেও আপনি রেগুলার ফ্লায়ার হয়ে থাকলে পার্থক্যটা খুব ভালোভাবেই চোখে পড়বে। যাই হোক, আপনি অলরেডি ফ্লাই করে থাকলে অবশ্যই নিচে কমেন্টে অবশ্যই আপনার অভিজ্ঞতা জানাবেন।

৫। সাশ্রয়ী টিকেট মূল্য

নভোএয়ারের টিকেটের দাম যাত্রীর নাগালের মধ্যেই। চট্টগ্রাম – ঢাকা রুটে ২৫০০ টাকা, ঢাকা – কক্সবাজার রুটে ৩৫০০ টাকা এবং বাকি অভ্যন্তরীণ রুটগুলোতে ২৭০০ টাকা থেকে ওয়ান ওয়ে ফেয়ার শুরু হয়। তবে এই ফেয়ার পেতে আপনাকে আগেভাগেই টিকেট করে রাখতে হবে। এটা আসলে সব বিমানের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। যত আগে করবেন, টিকেটের দাম তত কম পাবেন। সব বিমানের ডোমেস্টিক ফ্লাইটের মূল্য জানতে এইখানে ক্লিক করুন

এছাড়া নভোএয়ার বিভিন্ন দিবসে এর চাইতেও কম দামে টিকেটের অফার দেয়। তাছাড়া তাদের ওয়েবসাইট থেকে জিপি স্টার এবং বিভিন্ন ব্যাংকের ক্রেডিট কার্ডে তারা সর্বোচ্চ ১০% ডিসকাউন্ট দিয়ে থাকে।

৬। অনেক লেগ রুম এবং আরামদায়ক সিট

এই হেডিং দেখে আপনার মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, সিটে বসে আরাম করে ফ্লাই করবো। পায়ের স্পেস দিয়ে কাজ কি? আপনি যদি মোটামুটি লম্বা হয়ে থাকেন, আর বিমানের সিটে যথেষ্ট লেগ স্পেস না থাকলে সেই আরাম কষ্টে পরিণত হবে। বিশেষ করে বাজেট এয়ারলাইন্সগুলো তে যথেষ্ট লেগ রুম অথবা লেগ স্পেস থাকেনা। ইন্ডিয়াতে স্পাইসজেটের সিটে বসে পা পর্যন্ত নাড়াতে পারিনি। এই অভিজ্ঞতা কেবল আমাদের দেশের লোকাল বাস গুলোতেই হয়।

নভোএয়ারে সেই কষ্ট নেই। যথেষ্ট লেগ রুম আছে। আরাম করে ফ্লেক্সিবল ভাবেই ফ্লাই করতে পারবেন। একটি ফ্রি টিপস দিয়ে রাখি। বিমানের মাঝামাঝি দিকে ইমারজেন্সি এক্সিট গেইট থাকে। এক্সিট গেইটের সিট গুলোতে সবচাইতে বেশি লেগ স্পেস থাকে। হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে বসতে চাইলে চেকিনের সময় বলে দিবেন এক্সিট রো তে সিট দিতে। ভোএয়ারের সিট এরেঞ্জম্যান্ট সিস্টেম ২-২। অনেকটা বাসের মতই।

৭। কোন এক্সিডেন্ট রেকর্ড নেই

এটাই নভোএয়ার পছন্দ করার আপনার প্রধান কারণ হতে পারে। ইদানিং বেশ কিছু অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে। এমনকি ল্যান্ডিং এর সময় চাকা ফেটে যাওয়াও কমন ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেইখানে নভোএয়ারের কোন এক্সিডেন্ট করার রেকর্ড নেই। দক্ষ পাইলট এবং দক্ষ ইঞ্জিনিয়ার এর প্রধান কারণ। অন্য বিমান কোম্পানির এয়ারক্রাফট গুলোর তুলনায় নভোএয়ারের এয়ারক্রাফটগুলো নতুন।

Novoair’s ATR 72-500 Aircraft. Source: Shadman Samee / Flickr

তাছাড়া ছোট ফ্লাইট হওয়াতে বিরূপ আবহাওয়ায় তারা নরমালি ফ্লাইট কেন্সেল করে অথবা পরিবেশ ঠিক হওয়া পর্যন্ত ওয়েট করে। নভোএয়ারের কেবিনে কিন্তু ইঞ্জিনের সাউন্ড খুব বেশি শোনা যায়না। অনেক বড় ফ্লাইটেই অতিরিক্ত আওয়াজের কারণে প্যাসেঞ্জাররা যথেষ্ট বিরক্ত হন।

৮। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার

নভোএয়ার প্রতিটি ফ্লাইটেই সুস্বাদু এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন করে। ফ্লাইটে লোড করার আগে দক্ষভাবে প্রতি ব্যাচের খাবারের গুনাগুণ কঠোরভাবে চেক করা হয় যাতে কোন ধরনের কমপ্লেইন না আসে।

সকাল, দুপুর, বিকাল এবং রাতের উপর নির্ভর করে তারা খাবারের ধরনেই চেঞ্জ আনে যাতে একই ধরনের খাবার খেয়ে যাত্রী বোরিং ফিল না করেন।

৯। ইনফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্ট

নভোনীল ম্যাগাজিন, নভোএয়ার
নভোনীল ইনফ্লাইট ম্যাগাজিন. Copyright: Airinfobd.com

সল্প সময়ের যাত্রা হওয়াতে এবং ছোট এয়ারক্রাফট হওয়াতে নভোএয়ারে খুব বেশি ফ্লাইট এন্টারটেইনমেন্টের দরকার নেই। তারপরেও নভোএয়ার ‘নভোনীল’ নামে প্রতি মাসে তাদের ইনফ্লাইট ম্যাগাজিন পাবলিশ করে। এছাড়াও সকালের ফ্লাইটে নিউজপেপার প্রোভাইড করা হয়। ৩০-৫০ মিনিটের ফ্লাইটে আসলে এর চাইতে বেশি কিছু দরকারও পরেনা।

১০। অন টাইম ফ্লাইট

বর্তমানে এত ফ্লাইট ডিলের মাঝে সবচাইতে অন টাইমে ফ্লাইট অপারেট করে নভোএয়ার। জরুরি কাজে কোথাও যাচ্ছেন? অন টাইমে মিটিং এ এটেন্ড করতে হবে? তাহলে নভোএয়ারের বিকল্প নেই। আগেও বলেছি কম সীটের এবং কম রুটের বিমান হওয়াতে ফ্লাইট নিয়ে খুব বেশি ঝামেলায় পড়তে হয়না নভোকে। যদিও আসছে সময় ব্যাংকক, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মাস্কাট সহ আরো বহু রুটে ফ্লাইট অপারেট করার ইচ্ছা আছে নভোএয়ারের।

Original Article By Admin Marwan from AirinfoBD.com. Please do not copy paste anywhere without permission & courtesy.

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!