ট্যুরিস্ট ভিসায় লিবিয়ায় মানবপাচারে সক্রিয় দেশীয় দালাল

মানবপাচারে সক্রিয় দেশীয় দালালরা প্রথমে ঢাকায় অবস্থান নেয়। পরে বেনগাজিতে মানবপাচারের জন্য স্থানীয় দালালদের কাছ থেকে প্রাপ্ত পাসপোর্ট স্ক্যান করে সফট কপি দুবাই এবং লিবিয়ায় পাঠায়। সেখান থেকে ট্যুরিস্ট ভিসা এবং অন অ্যারাইভাল মোয়াফাকা সংগ্রহ করার পরে বেনগাজিতে ক্যাম্পে নির্ধারণ করে। এরপর বিভিন্ন চুক্তিতে ভিকটিমদের লিবিয়া পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু করে দালালরা।

সোমবার (৮ জুন) দুপুরে ডিএমপি’র মিডিয়া অ্যান্ড পাবলিক রিলেশন্স বিভাগে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন এসব কথা জানান।

গত ২৮ মে লিবিয়ায় মানবপাচারের শিকার ২৬ বাংলাদেশিকে হত্যা ও ১১ জন আহতের ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ। গ্রেফতাররা হলেন- বাদশা মিয়া, জাহাঙ্গীর মিয়া, আকবর আলী, সুজন, নাজমুল হাসান ও লিয়াকত শেখ ওরফে লিপু।

রোববার (৭ জুন) গোয়েন্দা বিভাগের একাধিক টিম রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে তাদের গ্রেফতার করে। এ সময় তাদের হেফাজত থেকে চারটি পাসপোর্ট, দুটি মোবাইল ফোন ও টাকার হিসাব সম্মলিত দুটি নোট বুক উদ্ধার করা হয়।

ডিবি পুলিশ বলছে, লিবিয়া এবং ইতালিতে অভিবাসী হতে যাওয়া শত শত বাংলাদেশি বিভিন্ন সময়ে নির্যাতনে আহত, নিহত ও নিখোঁজ হয়েছেন। এসব ঘটনায় ভিকটিমদের আত্মীয়-স্বজনদের অভিযোগের প্রেক্ষিতে মাদারীপুর, কিশোরগঞ্জ এবং ডিএমপি’র পল্টন ও তেজগাঁওয়ে পৃথক মামলা নথিভুক্ত হয়।

সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপি’র অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ডিবি) মো. আবদুল বাতেন বলেন, মানব পাচারের ঘটনায় ভিকটিমদের ভারত, দুবাই, মিসর হয়ে লিবিয়ায় পাচার করার পরিকল্পনা, প্রক্রিয়া এবং ক্ষেত্রবিশেষে ঢাকা বিমানবন্দর ব্যবহার করার কারণে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ দায়েরকৃত মামলাসমূহের ছায়া তদন্ত শুরু করে।

তিনি বলেন, লিবিয়ার বিভিন্ন এস্টেটে কাজ ও লিবিয়া থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নেয়ার প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশি দালালরা অন অ্যারাইভাল ও ভিজিট ভিসার মাধ্যমে লোকজন লিবিয়ায় পাচার করে।

লিবিয়ায় পাচারের পর ভিকটিমদের লিবিয়ার বিভিন্ন ক্যাম্পে আটক রেখে অমানুষিক শারীরিক এবং মানসিক নির্যাতন করে তারা। নির্যাতিত ভিকটিমদের কান্নাকাটি, আকুতি-মিনতি করা অডিও অথবা সরাসরি মোবাইলে কথাবর্তা বাংলাদেশে অবস্থানরত তাদের পিতা-মাতা আত্মীয়-স্বজনদের পাঠিয়ে টাকা দাবি করে। ভিকটিমদের বাচাঁতে তার আত্মীয়-স্বজন অনেক ক্ষেত্রে ভিটাবাড়ি বিক্রি করে টাকা পাঠায়।

তিনি আরও জানান, নিহত মাদারীপুরের সাতজনকে বাংলাদেশ থেকে লিবিয়ায় আমির হোসেনের কাছে পাচার করেছিল তার ভাই গ্রেফতার আকবর আলী।

এদিকে গ্রেফতার বাদশা মিয়া ১৩ বছর ধরে লিবিয়ায় অবস্থান করছেন। লিবিয়ার বেনগাজী জোয়ারা শহরে তার নিজস্ব ক্যাম্প আছে। পুরো বাংলাদেশ থেকে সে নিয়মিত লিবিয়ায় মানবপাচার করে। পাচারকৃত বাংলাদেশিদের তার ক্যাম্পে আটক রেখে সমুদ্রপথে ইতালি পাঠানোর gambling (ঝুঁকি) করে। মাদারীপুরের নিহতদের মধ্যে চারজনকে তার ক্যাম্পে আটক রেখে লিবিয়ার ত্রিপোলীতে পাচার করার এক পর্যায়ে এ হত্যাকাণ্ড ঘটে।

সংবাদ সম্মেলনে আবদুল বাতেন বলেন, গ্রেফতার জাহাঙ্গির আলম ঢাকায় অবস্থান করে নিজস্ব কায়দায় বেনগাজিতে মানবপাচার ছাড়াও স্থানীয় দালালদের কাছ থেকে প্রাপ্ত পাসপোর্ট স্ক্যান করে সফট কপি দুবাই এবং লিবিয়ায় প্রেরণ করে ট্যুরিস্ট ভিসা, অন অ্যারাইভাল মোয়াফাকা সংগ্রহ করার পরে বেনগাজির ক্যাম্প নির্ধারণ করে। গ্রেফতার সুজন ভিকটিম ইছার উদ্দিন, বিজয় ও সজলকে লিবিয়ায় পাঠিয়েছেন।

গত ২৮ মে লিবিয়ায় ট্র্যাজেডিতে ভিকটিম মো. সজল আহত হয়ে লিবিয়ায় এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। নিখোঁজ মো. বিজয় ও ইছার উদ্দিনের কোনো সন্ধান মেলেনি এখনো।

গ্রেফতারদের পল্টন থানা ও তেজগাঁও থানায় মানবপাচার এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনে রুজুকৃত মামলায় আদালতে পাঠানো হয়েছে বলে জানান আব্দুল বাতেন।

Source Link

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!