টানা অষ্টমবারের মতো বিশ্বসেরা বিমানবন্দর সিঙ্গাপুরের চাঙ্গি

আবারও আকাশপথে নিয়মিত যাতায়াতের জন্য আনচান করছে ভ্রমণপ্রেমীদের মন। বেশিরভাগ মানুষই স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ চেয়ে ঘরবন্দি। আশার কথা হলো, বিভিন্ন দেশে ভ্রমণের বিধিনিষেধ শিথিল হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে প্রতিবছরের মতো যাত্রীদের ভোটে দেওয়া হলো ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডস।

২০২০ সালের শীর্ষ ১০ বিমানবন্দরের তালিকায় এক নম্বরে যথারীতি আছে সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর। এ নিয়ে টানা অষ্টমবারের মতো বিশ্বসেরা বিমানবন্দরের মুকুট জিতলো সিঙ্গাপুর। স্কাইট্র্যাক্স ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডসে গত ২০ বছরে সব মিলিয়ে ১১ বার এই সম্মান পেলো চাঙ্গি।


গত ১০ মে ইউটিউবে ভার্চুয়াল লাইভ অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২০ সালের বিজয়ী বিমানবন্দরগুলোর নাম ঘোষণা করে যুক্তরাজ্য ভিত্তিক এভিয়েশন শিল্প সমালোচক প্রতিষ্ঠান স্কাইট্র্যাক্স। গত ১ এপ্রিল প্যারিসে প্যাসেঞ্জার টার্মিনাল এক্সপোতে এটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু কোভিড-১৯ মহামারির কারণে এই মেলা বাতিল হয়েছে।

ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডসের বিজয়ী তালিকা ঘোষণা প্রসঙ্গে স্কাইট্র্যাক্সের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) এডুয়ার্ড প্লেইস্টেড বলেন, ‘প্রায় ছয় সপ্তাহের জন্য আমরা পুরস্কার অনুষ্ঠান স্থগিত রেখেছিলাম। আমাদের মনে হয়েছে, চলমান কঠিন সময়ে বিমানবন্দর শিল্পকে কিছুটা চাঙ্গা করার এখনই সময়।’

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বিশ্বের ৫৫০টি বিমানবন্দর নিয়ে জরিপ পরিচালনা করেছে স্কাইট্র্যাক্স। এতে অংশ নেন শতাধিক দেশের ১ কোটি ৩৫ লাখ যাত্রী। উচ্চ প্রযুক্তির সুবিধা, কর্মীদের বন্ধুসুলভ ব্যবহার, অবসর কাটানোর অফুরান সুযোগ, গতিময় ইমিগ্রেশন সেবা— এসব মিলিয়ে সেরা বিমানবন্দর নির্বাচন হয়।

সিঙ্গাপুরের জয় এবার অনেকটা অবধারিত ছিল। গত বছরের এপ্রিলে চাঙ্গি বিমানবন্দরে চালু হয় নতুন টার্মিনাল ‘জুয়েল’। এটি নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ১০ হাজার ৪৮০ কোটি ৭৫ লাখ টাকা। চাঙ্গি বিমানবন্দরের ১, ২ ও ৩ নম্বর টার্মিনালকে সংযুক্ত করেছে ১ লাখ ৩৭ হাজার বর্গমিটার আয়তনের কমপ্লেক্সটি। এর সুবাদে টিকিট, বোর্ডিং পাস ও ব্যাগেজ স্টোরেজের আনুষ্ঠানিকতা শেষে যাত্রীরা তাদের ফ্লাইটে দ্রুত চেক-ইনের সুবিধা পান।

বিশ্বখ্যাত স্থপতি মোশে সাফদির ডিজাইনে জুয়েল চাঙ্গি পুরোটাই স্টিলের ফ্রেমে কাচ দিয়ে ঘেরা। এটি মোট ১০ তলা। কমপ্লেক্সের কেন্দ্রবিন্দু ১৩০ ফুট (৪০ মিটার) উঁচু ‘রেইন ভরটেক্স’। এটাই বিশ্বের সবচেয়ে লম্বা ইনডোর ঝরনা। রাতে এটি আলোকিত হয়ে ওঠে নানান রঙের বাতিতে। এছাড়া থাকে সাউন্ড শো।

দশম তলায় ১৪ হাজার বর্গমিটারের ক্যানোপি পার্কের অন্যতম তিন আকর্ষণ স্কাই নেটস (২৫০ মিটারের বাউন্সিং নেট ও ৫০ মিটারের ওয়াকিং নেট), ক্যানোপি মেজেস ও ডিসকভারি স্লাইডস। এর মধ্যে দুটি মেজ ডিজাইন করেছেন বিখ্যাত ডিজাইনার আড্রিয়ান ফিশার। ২৩ মিটার উঁচুতে ৫০ মিটার দীর্ঘ ক্যানোপি ব্রিজ থেকে রেইন ভরটেক্স ও ফরেস্ট ভ্যালি দেখতে দারুণ লাগে।

ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডসে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বসেরা বিমানবন্দর হোটেলের সম্মান ধরে রেখেছে ক্রাউন প্লাজা চাঙ্গি। অনলাইন অনুষ্ঠানে চাঙ্গি এয়ারপোর্ট গ্রুপের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) লি সিউ হিয়াংয়ের অডিও ক্লিপ চালানো হয়। তিনি বলেন, ‘ভ্রমণকারীদের কাছ থেকে এই স্বীকৃতি গ্রহণ করতে পেরে আমরা কৃতজ্ঞ। চাঙ্গির অংশীদারদের সহযোগিতা থাকায় এটি সম্ভব হয়েছে। এটি আমাদের জন্য চ্যালেঞ্জিং বছর। অন্যদের মতো চাঙ্গিতে আমরা ভ্রমণকারী, দর্শনার্থী ও বিমানবন্দর কর্মীদের স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। এভিয়েশন খাতের সবার জন্য রইলো শুভকামনা। আসুন সুদিনের অপেক্ষায় থাকি।’

গতবারের মতো এ বছর ওয়ার্ল্ড এয়ারপোর্ট অ্যাওয়ার্ডসে পূর্ব এশিয়ার জয়জয়কার। শীর্ষ ১০টির মধ্যে সাতটিই এই অঞ্চলের। এর মধ্যে জাপানের আছে চারটি। এবারের র‌্যাংকিংয়ে দুই নম্বর স্থান অক্ষুণ্ন রেখেছে জাপানের রাজধানী টোকিওর হানেদা বিমানবন্দর। বিশ্বসেরা অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দর ও বিশ্বের পরিচ্ছন্ন বিমানবন্দর স্বীকৃতি দুটি পেয়েছে এটি।

নয় নম্বর থেকে সাতে উঠেছে টোকিওর নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এছাড়া বিমানবন্দরের খাবার বিভাগে সেরা হয়েছে এটি। ছয় থেকে আটে ছিটকে গেছে জাপানের নাগয়া শহরের চুবু সেন্ট্রেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিশ্বসেরা আঞ্চলিক বিমানবন্দর পুরস্কার পেয়েছে এটি।

তিন নম্বর থেকে চারে নেমে গেছে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এখানকার টি২ বিশ্বসেরা বিমানবন্দর টার্মিনাল স্বীকৃতি পেয়েছে। চার থেকে তিনে উঠে এসেছে কাতারের দোহায় অবস্থিত হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর।

সাত থেকে পাঁচে উঠে এসেছে জার্মানির মিউনিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। আর পাঁচ থেকে ছয়ে নেমেছে হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এটি জিতেছে বিমানবন্দরে বিশ্বসেরা ইমিগ্রেশন বিভাগের পুরস্কার।

৯ নম্বরে আছে নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডাম বিমানবন্দর স্কিপল। ১০ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছে জাপানের ওসাকার কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। বিমানবন্দরে কর্মীদের সেবা বিভাগে সেরা হয়েছে কানসাই।

এশিয়ার বাইরে গতবার আট নম্বরে থাকা লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দর ও ১০ নম্বর স্থান পাওয়া সুইজারল্যান্ডের জুরিখ বিমানবন্দর এবার তালিকায় নেই। এবারের র‌্যাংকিংয়ে হিথ্রো আছে ১২ নম্বরে। এছাড়া বিমানবন্দরে শপিংয়ের জন্য সেরা হয়েছে এটি। বিশ্বের সবচেয়ে উন্নত বিমানবন্দর স্বীকৃতি গেছে প্যারিসের ওরলি বিমানবন্দরে।

শীর্ষ ৩০ বিমানবন্দরের তালিকায় ঠাঁই পায়নি যুক্তরাষ্ট্র। তবে সেরা বিমানবন্দর ওয়েবসাইট ও ডিজিটাল সেবা পুরস্কার পেয়েছে হাউস্টনের জর্জ বুশ ইন্টারকন্টিনেন্টাল বিমানবন্দর।

২০২০ সালে বিশ্বের শীর্ষ ১০ বিমানবন্দর
১. সিঙ্গাপুর চাঙ্গি বিমানবন্দর
২. হানেদা বিমানবন্দর (টোকিও, জাপান)
৩. হামাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দোহা, কাতার)
৪. ইনচিওন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (দক্ষিণ কোরিয়া)
৫. মিউনিখ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (জার্মানি)
৬. হংকং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর
৭. নারিতা আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (টোকিও, জাপান)
৮. চুবু সেন্ট্রেয়ার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (নাগয়া, জাপান)
৯. আমস্টারডাম বিমানবন্দর স্কিপল (নেদারল্যান্ডস)
১০. কানসাই আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর (ওসাকা, জাপান)

Source Link

Facebook Comments

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!